শুভদীপ মাহাতো, পুরুলিয়া:
দেশ আগে, জীবন তুচ্ছ। চোখের সামনে পরমবীর চক্রে ভূষিত সেনাদের ছবি। চোখের সামনে পুরুলিয়া সৈনিক স্কুলেরই প্রাক্তন এমন এক ক্যাডেটের প্রতিকৃতি অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে ঢুকে দুই নাগরিককে বাঁচাতে গিয়ে যিনি আত্মোৎসর্গ করেছিলেন। আর রয়েছে পুরুলিয়া সৈনিক স্কুলেরই প্রাক্তন ছাত্র অরূপ রাহার স্ট্যাচু, যিনি পরে ভারতীয় বায়ুসেনার প্রধানের দায়িত্ব সামলেছেন। এমন অসংখ্য অনুপ্রেরণার গল্প ঘিরেই বড়ো হচ্ছে পুরুলিয়া সৈনিক স্কুলের ছেলেরা-মেয়েরা। তাদের লক্ষ্য একটাই দেশের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনে জীবনও তুচ্ছ করা।
পুরুলিয়া সৈনিক স্কুলের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র জয়ন্ত সাই পট্টনায়েক বলেন, "সৈনিক স্কুল পুরুলিয়ায় আমরা শুধু পড়াশোনাই করি না, প্রতিদিন বিকেলে ফুটবল, বাস্কেটবল, হকি ও ঘোড়সওয়ারির মতো খেলাধুলার মাধ্যমে নিজেদের ফিটনেস, দলগত ভাব ও নেতৃত্বের গুণাবলি গড়ে তুলি। এছাড়া কুকিং, ফটোগ্রাফি ও ইউথ লিডারশিপের মতো ক্লাব এক্টিভিটিজে অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রযুক্তিগত দক্ষতার জন্য আমাদের স্মার্ট ক্লাসরুম ও 'এটিএল ল্যাব' রয়েছে, যেখানে এআই এবং নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে আমরা উদ্ভাবনী চিন্তা ও বাস্তব সমস্যা সমাধানের অভিজ্ঞতা অর্জন করি"।
বৃহস্পতিবার ভারতীয় বায়ুসেনা দিবসে দেশরক্ষার স্বপ্নে শান দিতে এগোচ্ছে পুরুলিয়া সৈনিক স্কুল। এ বার এয়ার ফোর্স ডে-র অনুষ্ঠানকে ‘অপারেশন সিন্দুর’-কে উৎসর্গ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি তুলে ধরা হচ্ছে উইং কমান্ডার ব্যোমিকা সিংহ এবং কর্নেল সোফিয়া কুরেশির মতো মহিলা সেনা আধিকারিকদের উদাহরণ। তাঁদের মতো দেশের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করার স্বপ্নই এখন পুরুলিয়ার সৈনিক স্কুলের মেয়েদের চোখে। ২০২২ সালে পুরুলিয়া সৈনিক স্কুলে শুরু হয় মেয়েদের পড়াশোনা। নিয়ম সৈনিক স্কুলগুলিতে মোট আসনের ১০ শতাংশ ছাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট। বর্তমানে এই স্কুলে পড়ছেন ৬০ জন ছাত্রী। তাঁদের মধ্যে প্রথম ব্যাচের সবচেয়ে সিনিয়র গার্ল ক্যাডেটরা এখন একাদশ শ্রেণিতে। আগামী বছর দ্বাদশে পা দেবেন তাঁরা। ফলে সেনাবাহিনী, বায়ুসেনা কিংবা প্রতিরক্ষা বাহিনীতে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতিও এখন থেকেই জোরদার।
পুরুলিয়া সৈনিক স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্রী মায়েশা হক ও ছাত্রী ভূমিকা বণিক মজুমদার জানান, " আমরা মেয়েরাও যে পারি সেটা আমরা দেখিয়ে দিতে চাই। আমাদের আদর্শ ব্যোমিকা সিং, সোফিয়া কুরেশি।"
১৯৬২ সালের ২৯ জানুয়ারি কর্নেল এস মজুমদারের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পুরুলিয়া সৈনিক স্কুল। ৬৪ বছরের সেই পথ চলায় এখনও পর্যন্ত প্রায় ৪০০ জন পুরুষ ক্যাডেট ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। এ বার সেই তালিকায় মেয়েদের নামও দেখতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
৩১৪ একর এলাকা জুড়ে থাকা এই স্কুলে বর্তমানে অধ্যক্ষ গ্রুপ ক্যাপ্টেন রজনীশ কুমার। তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির পরিকাঠামো ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায়ও একাধিক পরিবর্তন এসেছে। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্কুল পরিদর্শনে এসে প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সরাসরি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের বার্তাও দিয়েছেন। এত বড় পরিসরের প্রতিষ্ঠান চালাতে রক্ষণাবেক্ষণের খরচও কম নয়।
শুধু সামরিক প্রশিক্ষণ নয়, খেলাধুলাতেও ছেলে মেয়েদের সাফল্য নজর কাড়ছে। এ বার জাতীয় গেমসে পুরুলিয়া সৈনিক স্কুলের আট জন ছাত্রী অংশ নিতে চলেছেন। তাঁদের প্রতিভা দেখে আগামী দিনে কেউ কেউ কমনওয়েলথ গেমসেও জায়গা করে নিতে পারেন বলে আশাবাদী স্কুল কর্তৃপক্ষ। অন্য দিকে, এই প্রথম নেহরু কাপে অংশ নিতে চলেছে পুরুলিয়া সৈনিক স্কুল। জাতীয় স্তরের অনূর্ধ্ব-১৫ হকি প্রতিযোগিতায় খেলতে ১৯ অক্টোবর রওনা হবে স্কুলের দল।
স্কুলে রয়েছে পাঁচটি হাউস তিলক, চিত্তরঞ্জন, টেগোর, প্যাটেল এবং নেতাজি। প্রতিটিরই রয়েছে নিজস্ব ডাকনাম—টাস্কার্স, চিতা, টাইগার্স, প্যান্থার্স এবং নাইটহক্স। প্রতিযোগিতা, শৃঙ্খলা এবং দলগত চেতনার মধ্য দিয়ে ক্যাডেটদের মধ্যে তৈরি হয় নেতৃত্বের মানসিকতা।
পুরুলিয়া সৈনিক স্কুল একাদশ শ্রেণী ছাত্র দেবজিৎ মাঝি বলেন,"ক্যাডেটদের শারীরিক শিক্ষা, গেমস, নিয়মিত পড়াশোনা এবং নেতৃত্বের দায়িত্ব অনুশীলনের মাধ্যমে সৈনিক স্কুল পুরুলিয়া একজন শিক্ষার্থীকে এনডিএ-র জন্য প্রস্তুত করে তোলে। সেখানে ফ্লেক্সিবল মাইন্ডসেট, ইংরেজি বলার দক্ষতা এবং টিমকে চালনা করার লিডারশিপ কোয়ালিটির ওপর জোর দেওয়া হয় যাতে এসএসবি ইন্টারভিউতে তাদের সততা প্রকাশ পায়। ক্যাডেটের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য হলো এনডিএ পাস করে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া, যার মধ্যে গোর্খা রেজিমেন্ট এবং প্যারা এসএফ আমার প্রধান পছন্দ"।
শুধু নিজেদের পড়ুয়াদের সেনাবাহিনীতে পাঠানোই নয়, জঙ্গলমহল তথা পুরুলিয়ার আরও ছেলে-মেয়েকে প্রতিরক্ষা বাহিনীতে যোগদানের জন্য প্রস্তুত করার পরিকল্পনাও করছে সৈনিক স্কুল। জেলার অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়াদের নিয়েও কর্মশালা করার ভাবনা রয়েছে। এ বিষয়ে পুরুলিয়ার সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রাথমিক কথাবার্তাও হয়েছে।
পুরুলিয়া সৈনিক স্কুলের গ্ৰুপ ক্যাপ্টেন রজনীশ কুমার বলেন, "এখন আমাদের সৈনিক স্কুল পুরুলিয়াতে প্রায় ৬০ জন মেয়ে লেখাপড়া করছেন। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রগতিশীল পদক্ষেপ। কারণ এখন তারা মূলধারায় আমাদের সঙ্গেই আছেন। তাই তাদের প্রশিক্ষণ আলাদা করে কিছু দেওয়া হয় না। ছেলেদের যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় মেয়েদেরও অনুরূপ প্রশিক্ষণই দেওয়া হয়। এবং ধীরে ধীরে তারাও প্রমাণ করে দিয়েছেন যে তারা কোন অংশেই ছেলেদের চেয়ে কম নয়। যখন তারা আগামী বছর দ্বাদশ শ্রেণী ও এনডিএ পরীক্ষা দেবে তার ফল থেকেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। "
১৯৩২ সালের ৮ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ভারতীয় বায়ুসেনা। সেই দিনটিই প্রতি বছর এয়ার ফোর্স ডে হিসাবে পালিত হয়। এ বার সেই দিনটিকেই ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত করেছে পুরুলিয়া সৈনিক স্কুল। বুদ্ধ-অশোকের অহিংসার বাণী যেমন ভারতের পরিচয়, তেমনই প্রয়োজনে শত্রুর ঘরে ঢুকে প্রত্যাঘাত করার ক্ষমতাও দেখেছে বিশ্ব। ‘অপারেশন সিন্দুর’-এ ভারতীয় বায়ুসেনার ভূমিকা ও গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। আর সেই বার্তাই এ বার ছড়িয়ে দিতে চায় পুরুলিয়া সৈনিক স্কুল—দেশের নিরাপত্তার প্রশ্নে নারী-পুরুষের বিভাজন নয়, সামনে থাকবে শুধু একটাই পরিচয়—ক্যাডেট, এবং ভবিষ্যতের সৈনিক।