সুইটি চন্দ্র, পুরুলিয়া
পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক হকার উচ্ছেদ অভিযান, পুনর্বাসন নীতি এবং সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের অব্যবস্থা নিয়ে শাসকদলের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিল পুরুলিয়া জেলা কংগ্রেস। জেলা কংগ্রেস কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে পুরুলিয়া জেলা কংগ্রেসের সভাপতি নেপাল মাহাতো এবং জেলা কংগ্রেসের অন্যতম নেতা পার্থসারথি দাস রাজ্য সরকারের বিভিন্ন নীতি ও রাজনৈতিক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন।
সাংবাদিক সম্মেলনের শুরুতেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দলবদল নিয়ে শাসকদলকে নিশানা করেন কংগ্রেস নেতৃত্ব। তাদের অভিযোগ, বর্তমান সরকারি দল ক্ষমতার স্বার্থে এই দলবদলকে ক্রমাগত উসকে দিচ্ছে। মেম্বার অব পার্লামেন্ট ভেঙে নতুন একটি দল তৈরি করে তা ওয়েবসাইটে রেজিস্টার করা হয়েছে, যাতে দলত্যাগ করলেও সদস্যদের সদস্যপদ টিকে থাকে।
এই পরিস্থিতিতে সাধারণ তৃণমূল কর্মীরা চরম দিশাহারা এবং তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্ধকারের মুখে। পুরুলিয়া জেলা কংগ্রেসের পক্ষ থেকে দিশাহারা তৃণমূল নেতাকর্মী ও সাধারণ কর্মীদের জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। কংগ্রেস নেতারা দলমতনির্বিশেষে সকলকে রাহুল গান্ধীর হাত শক্ত করার এবং বিজেপিকে পরাস্ত করতে একযোগে লড়াইয়ের ডাক দেন।
কংগ্রেসের সভাপতি নেপাল মাহাতো বলেন, "রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি পুরুলিয়া জেলাতেও পুরসভা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় যেভাবে হকার, ভেন্ডার এবং অস্থায়ী দোকান উচ্ছেদ করছে, তার তীব্র বিরোধিতা করে কংগ্রেস। তবে কংগ্রেস কোনো অবস্থাতেই বেআইনিভাবে রাস্তা বা জায়গা দখলকে সমর্থন করেন না। সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুবিধার জন্য সব ব্যবস্থা নিয়ম মেনেই হওয়া উচিত। কিন্তু এই হকারদের সঙ্গে হাজার হাজার মানুষের রুটিরুজি জড়িয়ে রয়েছে। কোনো বিকল্প কর্মসংস্থান বা কলকারখানা না থাকায় তারা পুরোপুরি এই ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল।"
তিনি আরও জানান, "হকার উচ্ছেদের আগে কমপক্ষে ৩০ দিনের লিখিত নোটিশ দিতে হবে এবং কর্তৃপক্ষের কাছে শুনানির ব্যবস্থা করতে হবে। মাইক দিয়ে ঘোষণা করে রাতারাতি বা মাত্র এক ঘণ্টার নোটিশে দোকান ভাঙা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অমানবিক।শুনানির মাধ্যমে হকারদের আয়ের সঠিক মূল্যায়ন করতে হবে এবং আইন অনুযায়ী সেই আয়ের সমতুল্য বিকল্প পুনর্বাসনের ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করার পরই উচ্ছেদ করা যাবে।"
নারীদের জন্য মাসে ৩,০০০ টাকার নতুন যোজনা (যা আগে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে ১,৫০০ টাকা ছিল) চালুর উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও, এর বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন নেতারা।
কংগ্রেসের অভিযোগ, সরকারের একজন মহিলা মন্ত্রীর লাগামহীন ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের কারণে কারা এই সুবিধা পাবেন আর কারা পাবেন না, তা নিয়ে ব্লক স্তরের নেতা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এমনকি বেশ কয়েকজন বিডিও এই নিয়মকানুনের ব্যাপারে অন্ধকারে রয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন। এই তীব্র গরমে 'জনকল্যাণ শিবির'-এ গিয়ে মানুষ চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন, কারণ শিবিরে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ বা সুবিধা সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো প্রচার নেই। পাশাপাশি, বিডিও অফিস থেকে সাধারণ মানুষের জমা দেওয়া দরখাস্ত বা হার্ড কপি ভেরিফিকেশনের নামে রাজনৈতিক দলের নেতারা সরাসরি নিজেদের কব্জায় নিয়ে যাচ্ছেন বলেও গুরুতর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে এর আগে পুরুলিয়া শহর কংগ্রেসের পক্ষ থেকে মহকুমা শাসকের কাছে ডেপুটেশন দেওয়া হলে তিনি কিছু মৌখিক আশ্বাস দিয়েছিলেন। তবে কংগ্রেস নেতারা কেবল আশ্বাসে সন্তুষ্ট নন। নেপাল বাবুর দাবি, উচ্ছেদ হওয়া সমস্ত হকারদের একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রকাশ করতে হবে এবং তাদের হকার সার্টিফিকেট দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কর্তৃপক্ষ দায় এড়াতে না পারে।
কংগ্রেস নেতা পার্থসারথি দাস জানান,
"এই সমস্ত দাবির সমর্থনে এবং অমানবিক উচ্ছেদের প্রতিবাদে পুরুলিয়া জেলা কংগ্রেস সেবা দলের পক্ষ থেকে আগামী রবিবার সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত একটি প্রতীকী অবস্থান সত্যাগ্রহের ডাক দেওয়া হয়েছে, যার নামকরণ করা হয়েছে "পুনর্বাসন সত্যাগ্রহ"। সমস্ত ক্ষতিগ্রস্ত হকার ও সাধারণ মানুষকে এই আন্দোলনে শামিল হয়ে প্রতিবাদ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে জেলা কংগ্রেস।