শিক্ষা

নিজের ভাষায় প্রশ্নপত্র না মেলায় পুরুলিয়ায় সাঁওতালি মাধ্যমের পরীক্ষার্থীদের ক্ষোভ, কাঠগড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়

পরীক্ষার হলের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমগুলোতেও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে শিক্ষানুরাগীরা সোচ্চার হয়ে বলছেন, সংবিধানে যে ভাষাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, সেই ভাষার শিক্ষার্থীরা নিজেদের লিপিতে প্রশ্নপত্র পাওয়ার অধিকার থেকে কেন বঞ্চিত হবেন?
নিজের ভাষায় প্রশ্নপত্র না মেলায় পুরুলিয়ায় সাঁওতালি মাধ্যমের পরীক্ষার্থীদের ক্ষোভ, কাঠগড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়

নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া:


মাতৃভাষায় পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে এসেছিলেন তাঁরা। কিন্তু প্রশ্নপত্র হাতে পেতেই চক্ষু চড়কগাছ! সাঁওতালি ভাষা ও অলচিকি লিপির বদলে তাঁদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের প্রশ্নপত্র। গত ১৭ তারিখ পুরুলিয়ার লৌলাড়ার রামানন্দ সেন্টিনারি কলেজে পরীক্ষা দিতে গিয়ে এমনই চরম হয়রানির শিকার হলেন সাঁওতালি মাধ্যমের চতুর্থ সেমিস্টারের পাঁচ পড়ুয়া। সাংবিধানিক স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ভাষায় প্রশ্নপত্র না পাওয়ায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন পরীক্ষার্থী থেকে শুরু করে জনজাতি সমাজ।

সেদিন রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং ইতিহাস বিষয়ের পরীক্ষা ছিল। নিয়ম অনুযায়ী, এই পরীক্ষার্থীদের প্রশ্নপত্র সাঁওতালি ভাষায় ও অলচিকি লিপিতে হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ক্ষুব্ধ পড়ুয়ারা জানান, গত বছর যাঁরা পরীক্ষা দিয়েছিলেন, তাঁরা সাঁওতালি মাধ্যমেই প্রশ্নপত্র পেয়েছিলেন। এমনকি এই পড়ুয়ারা নিজেরাও প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় সেমিস্টারে নিজেদের ভাষাতেই পরীক্ষা দিয়েছেন। চতুর্থ সেমিস্টারে এসে হঠাৎ কেন এমন বিভ্রাট ঘটল, তা কিছুতেই বুঝতে পারছেন না তাঁরা।

ঘটনার দিন পরীক্ষার্থীরা যথাসময়ে হলে প্রবেশ করেন। নাম, ক্রমিক সংখ্যা খাতায় লেখার পর অনেকটা সময় কেটে যায়। এরপর প্রশ্নপত্র হাতে পেয়েই তাঁরা বুঝতে পারেন বিরাট ভুল হয়েছে। লালপুরের মহাত্মা গান্ধী কলেজের ছাত্র শঙ্কর সোরেনের সিট পড়েছিল রামানন্দ সেন্টেনারি কলেজে। পরীক্ষার হলের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, "প্রশ্নপত্র দেওয়ার সময় টিচারদের জিজ্ঞাসা করি, স্যার আমাদের কোশ্চেন কই? আমরা তো সাঁওতালি মিডিয়াম। তখন পরীক্ষক বলেন, পাঁচ মিনিট ওয়েট করো, কোশ্চেন আসছে। কিন্তু পাঁচ মিনিট পরেও তা আসেনি। কিছুক্ষণ পর অন্য একজন স্যার এসে বলেন, এদের কোশ্চেন আসেনি, যে স্ক্রিপ্টে কোশ্চেন এসেছে তাতেই পরীক্ষা দিতে হবে। আমি প্রতিবাদ করে বলি, স্যার আমি তো সাঁওতালি মিডিয়ামের ছাত্র, অন্য মিডিয়ামে কেন পরীক্ষা দেব? আমার সাঁওতালি মিডিয়ামের কোশ্চেন চাই। তখন স্যার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে স্ক্রিপ্ট এসেছে তাতেই পরীক্ষা দিতে হবে"।

এই অব্যবস্থার জেরে মোট পাঁচজন ছাত্র চরম অসুবিধায় পড়েন। এঁদের মধ্যে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শঙ্কর সোরেন ও কার্তিক মুর্মু এবং ইতিহাস বিভাগের সাগুন সোরেন, অমল হেমব্রম ও নির্মল টুডু ছিলেন। শঙ্কর এবং কার্তিক কলেজ হোস্টেলে থাকেন। শঙ্করের বাড়ি মালদহ জেলায়। ইতিহাস বিভাগের তিনজন রোজ বাড়ি থেকেই যাতায়াত করেন। পুরুলিয়া জেলার সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা লালপুরের মহাত্মা গান্ধী কলেজেই একমাত্র সাঁওতালি মাধ্যমে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। সেখানে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস এবং জুলজি, এই তিনটি বিষয় পড়ানো হয়।

এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সাঁওতাল শিক্ষক সংগঠনের পুরুলিয়া জেলা কমিটি এবং ভারত জাকাত মাঝি পারগানা মহল। ইতিমধ্যেই তারা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে কড়া চিঠি দিয়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে। সংগঠনগুলির দাবি, অবিলম্বে সাঁওতালি মাধ্যমের পড়ুয়াদের নিজেদের ভাষায় প্রশ্নপত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের শিক্ষাগত স্বার্থ রক্ষায় উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে লিখিত নিশ্চয়তাও চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, সাঁওতালি ভাষায় পঠনপাঠন ও পরীক্ষার জন্য একটি স্থায়ী পরিকাঠামো তৈরি করা এবং ফিজিক্স, জিওগ্রাফি, এডুকেশন ও ফিলোজফির মতো বিষয়গুলিতে অবিলম্বে সাঁওতালি মাধ্যমের অনুমোদন দেওয়ার দাবিও ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠির শেষে তারা দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার আবেদন জানিয়েছে।

পরীক্ষার হলের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমগুলোতেও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে শিক্ষানুরাগীরা সোচ্চার হয়ে বলছেন, এটি নিছক কোনো প্রশাসনিক গাফিলতি নয়, বরং সাঁওতালি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি চরম অবহেলার এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। সংবিধানে যে ভাষাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, সেই ভাষার শিক্ষার্থীরা নিজেদের লিপিতে প্রশ্নপত্র পাওয়ার অধিকার থেকে কেন বঞ্চিত হবেন, এখন সেই প্রশ্নই জোরালো হয়ে উঠেছে সর্বত্র।