ব্লক আমার জন্মভূমি

নদী-জঙ্গলে ঘেরা রাজা-রাজড়ার রাজধানী থেকে অনালোকিত জনপদ, কেশরগড়ে ছড়িয়ে মানভূমের ইতিহাস

পঞ্চকোটরাজ ভরতশেখর ওরফে গরুড়নারায়ণ ১৭৯২ সালে কেশরগড়ে রাজধানী স্হানান্তরিত করেন। এলাকাটি সেইসময় ছিল এক দুর্গম এলাকা। গেরিলা যুদ্ধে পারদর্শী রাজারা এই এলাকার ভৌগলিক অবস্থানকে মাথায় রেখে বহিঃশত্রু আক্রমণ থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে কেশরগড়কে পঞ্চকোটরাজ্যের রাজধানী নির্বাচন করেন।
নদী-জঙ্গলে ঘেরা রাজা-রাজড়ার রাজধানী থেকে অনালোকিত জনপদ, কেশরগড়ে ছড়িয়ে মানভূমের ইতিহাস

দেবীলাল মাহাতো

 

মানভূম পুরুলিয়ার প্রাচীন রাজবংশ পঞ্চকোট।আর এই  রাজবংশের ইতিহাসের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে হুড়ার কেশরগড়। রাজা মনিলালের মৃত্যুর পরে কাশিপুরের রামবনি থেকে রাজপরিবার তাঁদের  রাজধানী স্থানান্তরিত করেন কেশরগড়ে। কেশরগড় পঞ্চকোট রাজবংশের ষষ্ঠতম রাজধানী।

এখান থেকে ৩৯ বছর রাজত্ব করেছিল রাজপরিবার। মানভূমের সভ্যতা সৃষ্টিতে এই রাজবংশ অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল। পরবর্তীকালে ১৮৩২ সালে রাজধানী কেশরগড় থেকে আবার কাশিপুরে ফিরিয়ে আনা হয়। কেন আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছিল তার ইতিহাস সুদীর্ঘ।

হুড়া থানার অন্তর্গত পুরুলিয়ার এক প্রান্তিক গ্রাম কেশরগড়। রাকাব জঙ্গলের কোলে বিচ্ছিন্ন এই জনপদ নিরবে এক অনালোকিত ইতিহাসকে বুকে জড়িয়ে রেখেছে! প্রায় তিন সহস্রাধিক জনসংখ্যা সমন্বিত এই গ্রাম যথার্থ অর্থেই এক সমৃদ্ধ গ্রাম।  গ্রামের ইতিহাসেও অতীব সমৃদ্ধতর। বৈচিত্রময় এই গ্রামের ভৌগলিক অবস্থান ছিল অসাধারণ ।পূর্বে ও উত্তর দুদিকে পাতলুই নদী , দক্ষিণে কাঁসাই নদী  ও অবশিষ্ট একদিকে সুগভীর রাকাব জঙ্গল। এই জঙ্গলই  কেশরগড়ের সাথে পঞ্চকোট রাজবংশের রাজাদের অনুঘটকের কাজ করেছিল। রাকাব জঙ্গলই তাঁদের এখানে রাজধানী স্থাপন করতে প্রলুব্ধ করেছিল।

পঞ্চকোটরাজ ভরতশেখর ওরফে গরুড়নারায়ণ ১৭৯২ সালে কেশরগড়ে রাজধানী স্হানান্তরিত করেন।  এলাকাটি সেইসময় ছিল এক দুর্গম এলাকা। গেরিলা যুদ্ধে পারদর্শী রাজারা এই এলাকার ভৌগলিক অবস্থানকে মাথায় রেখে বহিঃশত্রু আক্রমণ থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে  কেশরগড়কে পঞ্চকোটরাজ্যের রাজধানী নির্বাচন করেন। পরবর্তীতে ১৮৩২ সালে তদানীন্তন পঞ্চকোটরাজ রাজা জগজীবনরাম কেশরগড় থেকে পঞ্চকোটের রাজধানী কাশিপুরে স্হানান্তরিত করেন। রাকাব জঙ্গল ঘেরা এই গ্রামে পঞ্চকোট রাজারা প্রায় চার দশকের সুদীর্ঘ রাজত্বকালে বিছিন্নভাবে রেখে গেছেন তাঁদের স্থাপত্যের নিদর্শন। গ্রামের বরিষ্ঠ বাসিন্দা মধুসূদন সেন বলেন , বেশ কিছুকাল আগেও গ্রামের বিস্তৃর্ণ অংশজুড়ে রাজাদের প্রাসাদ বা মন্দিরের ভগ্নাবশেষগুলো অনেকটাই অক্ষত ছিল। কিন্তু বর্তমানে তাঁদের অনেক স্থাপত্যই আজ সময়ের স্রোতে মাটিতে মিশে গেছে। সম্প্রতি সকল গ্রামবাসীর উদ্যোগে রাজ পরিবারের কুলদেবী 'দেবী মাতা'র মন্দির এবং 'শ্রী 'কালাচাঁদ জীউ'র মন্দির সংস্কার ও পুনঃনির্মান করা হলেও রাজাদের অনেক পুরাকীর্তিই আজ ধংসের মুখে। যে সমস্ত নির্মানশৈলী কালের বিপ্রতীপে এখনও বিরাজমান, তাদের মধ্যে অন্যতম হলো রাজাদের  তৈরী বিশেষ জলাধার 'রানিবাঁধ' যা স্থানীয়ভাবে 'পাকাও' নামে খ্যাত এবং যা আজও দর্শনার্থীদের মনে বিভ্রম জাগায়।

তবে গ্রামের নাম 'কেশরগড়'  কেন হল ?  বিষয়টি অবশ্য এখনও অজানা। তবে গ্রামের বয়স্কদের সাথে কথা বলে জানা গেল, 'কেশরগড়' শব্দটি 'কেশর' ও 'গড়' এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। কেশর (শেখর বা পঞ্চকোট রাজবংশের নাম) আর গড় শব্দের অর্থ দুর্গ ( যেখানে জনবসতি গড়ে উঠেছিল) । সেই কারণে নাম হয়েছিল কেশরগড় । আবার গ্রামের একাংশের মতে , এই রাজবংশ ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। রাজস্থান, ধানবাদেও কেশরগড় এলাকা রয়েছে। সেই কারনেই গ্রামের নাম কেশরগড় হয়ে থাকতে পারে। তাছাড়া দামোদর শেখরের নামানুসারে এই বিস্তৃর্ণ অঞ্চলের নামকরণ হয়েছিল 'শেখর ভূম' বা 'শিখর ভূম'। তাই তাঁদের তৈরি শাসনগড় বা দুর্গের নাম হয় কেশরগড় ।

হুড়ার মানচিত্রে কেশরগড় এক অদ্ভুত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে আজও অবস্থান করছে। বর্তমানে  ১২টি পাড়ায়  ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৪০০০। গঁরাই,সেন,ব্রাহ্মণ, কৈবর্ত্য, বাউরি, মুসলিম সম্প্রদায় মানুষের বসবাস ‌। গ্রামে রয়েছে একটি হাইস্কুল,দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পোষ্ট অফিস। রয়েছে একটি রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাঙ্কের শাখা।  সোম ও শুক্রবার গ্রামেই বসে সাপ্তাহিক হাট। সেখান থেকেই গ্রামের মানুষ সমস্ত নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাবেচা করেন। গ্রামেই তিন জায়গায় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। গ্রামের সকলেই তাতে অংশ নেন। তবে রাজপরিবার না থাকলেও দেবী মাতার পুজোর আলাদা মাহাত্ম্য রয়েছে।


আগের থেকে গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত হয়েছে বলে জানান গ্রামবাসীরা। পুরুলিয়া বাঁকুড়া জাতীয় সড়ক ৩১৪ থেকে কুলাবহাল মোড় থেকে সোজা পিচ রাস্তা গ্রামে এসে পৌঁছেছে। দক্ষিণে কোনাপাড়া কংসাবতী নদীঘাটে তৈরি হয়েছে পাকা সেতু। তবে ভাঙড়া থেকে যে বিকল্প একটি রাস্তা গ্রামে এসেছে, সেটি দীর্ঘদিন ধরে বেহাল। তাছাড়া সম্প্রতি কুলাবহাল থেকে কেশরগড় যাওয়ার রাস্তার উপর সেতুর ধস নামায় সমস্যায় পড়েছেন গ্রামবাসীরা। শ্রী শ্রী সারদা মায়ের সাক্ষাৎ দীক্ষিত শিষ্য শ্রী কৃষ্ণানন্দ মহারাজের তপোভূমি এই গ্রাম। রাকাব জঙ্গলের কোলে গুরু মহারাজের আশ্রম আজও দর্শনার্থীদের কাছে দ্রষ্টব্য স্হান। সুন্দরবনের বনবিবির মতো রাকাব জঙ্গলের বনদেবী "রাকাববুড়ি" স্থানীয় মানুষের কাছে জাগ্রত দেবী। জেলার পর্যটন মানচিত্রে রাকাবকে বুকে নিয়ে কেশরগড় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেতেই পারে। প্রশাসনিক সুনজরের অপেক্ষায় এই ঐতিহ্যমণ্ডিত গ্রাম।

▪️▪️▪️

বঙ্কিম চক্রবর্তী 
গ্রামের বাসিন্দা তথা কেশরগড়ের ইতিহাস গবেষক

পুরুলিয়ার বুকে অন্যতম বৈচিত্র্যপূর্ণ আমার গ্রাম কেশরগড়। ভৌগলিক অবস্থানের দিক থেকে এমন গ্রাম বোধহয় দ্বিতীয়টি নেই। বাউন্ডারির দেওয়ালের মতো গ্রামকে ঘিরে রেখেছে নদী, উপনদী আর ঘন জঙ্গল। উপর থেকে দেখলে মনে হয় ছোট্ট এক বদ্বীপ।  যেন প্রকৃতির নিজের হাতে আঁকা এক মানচিত্র। এই মাটির আরও এক গর্ব আছে। এই গ্রামেই জন্মেছিলেন পঞ্চকোট রাজবংশের অন্যতম নৃপতি নীলমণি সিং দেও। পরাধীন ভারতের বুকে যিনি সিপাহী বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই ঐতিহ্যমণ্ডিত গ্রামেই আমার জন্ম। ছোটবেলার প্রতিটি স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই নদী, জঙ্গল আর মাঠের সঙ্গে। কেশরগড় শুধু আমার ঠিকানা নয়, আমার পরিচয়। গর্ববোধের আশ্রয়।

▪️▪️▪️

শান্তনু চক্রবর্তী 
প্রধান শিক্ষক,কেশরগড় প্রাথমিক বিদ্যালয়

পুরুলিয়ার বুকে আমার জন্মভূমি কেশরগড় । প্রকৃতি নিজের হাতে যেন গ্রামকে ঘিরে রেখেছে । ইতিহাসও কথা বলে এই মাটিতে । শ্রী শ্রী সারদা মায়ের সাক্ষাৎ দীক্ষিত শিষ্য আধ্যাত্মিক ভাব আন্দোলনের পথপ্রদর্শক শ্রী কৃষ্ণানন্দ মহারাজের তপোভূমি এই গ্রাম। রাকাব জঙ্গলের কোলে গুরু মহারাজের আশ্রম আজও দর্শনার্থীদের কাছে দ্রষ্টব্য স্থান। সুন্দরবনের বনবিবির মতো রাকাব জঙ্গলের বনদেবী ‘রাকাববুড়ি’ স্থানীয় মানুষের কাছে সমধিক জাগ্রত দেবী । জঙ্গল ও নদী সমৃদ্ধ এই গ্রামের প্রাচীন পুরাকীর্তিগুলো যদি প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে যথাযথভাবে সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হয়, তাহলে এই গ্রাম অচিরেই জেলা পর্যটন মানচিত্রে এক উজ্জ্বল জায়গা করে নেবে। ইতিহাস, প্রকৃতি আর বিশ্বাস মিশে থাকা কেশরগড় আমার গর্ব।

▪️▪️▪️