সুজয় দত্ত
বই: বন্দে মাতরম্
লেখক: ড. গৌতম মুখোপাধ্যায় ও ড. জয়ন্ত মাজিগোপ
প্রকাশক: এভেনেল প্রেস, কলকাতা
দাম : ২৫০/-
‘বন্দে মাতরম্’— মাত্র দুটি শব্দ। অথচ এই দুই শব্দকে ঘিরেই দেড় শতাব্দীর ইতিহাস, আবেগ, আন্দোলন, বিতর্ক এবং জাতীয়তাবাদের এক জটিল যাত্রাপথ। সাম্প্রতিক সময়ে গানটিকে ঘিরে নতুন করে যখন রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত টানাপোড়েন সামনে এসেছে, তখন সেই আবহেই প্রকাশিত হল ইতিহাসবিদ ড. গৌতম মুখোপাধ্যায় এবং তাঁর ছাত্র ড. জয়ন্ত মাজিগোপের যৌথ গ্রন্থ বন্দে মাতরম্।
বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি, লেখকেরা আবেগের চেয়ে ইতিহাসকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মমাসে প্রকাশিত এই গ্রন্থ কেবল গানটির প্রশস্তি নয়, বরং তার জন্ম, বিকাশ, গ্রহণযোগ্যতা, বিতর্ক এবং উত্তরাধিকারের একটি ধারাবাহিক ইতিহাস নির্মাণের প্রয়াস।
গ্রন্থে বঙ্কিমচন্দ্র ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক বিশ্লেষিত হয়েছে। লেখকদের মতে, বঙ্কিমচন্দ্র কেবল সাহিত্যিক নন, আধুনিক ভারতীয় জাতীয় চেতনার অন্যতম নির্মাতা। আনন্দমঠ-এ সংযোজিত ‘বন্দে মাতরম্’ কীভাবে সাহিত্যিক পরিসর অতিক্রম করে স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্নিমন্ত্রে পরিণত হয়েছিল, তার বিশদ আলোচনা রয়েছে এখানে। দেশপ্রেমকে আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক উচ্চতায় উন্নীত করার ক্ষেত্রে গানটির ভূমিকা লেখকেরা যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন।
‘বন্দে মাতরম্’-এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যে বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, তার ঐতিহাসিক উৎস অনুসন্ধান করা হয়েছে গ্রন্থে। মুসলিম সমাজের একাংশ কেন গানটির পরবর্তী স্তবকগুলি নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন, ১৯৩৭ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতামত কী ছিল, কংগ্রেস কেন প্রথম দুটি স্তবককে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করেছিল— এসব প্রশ্নের উত্তর তথ্যনির্ভরভাবে খোঁজার চেষ্টা করেছেন লেখকেরা।
বইটির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল ইতিহাসবিদ সব্যসাচী ভট্টাচার্যের গবেষণাকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা। তাঁর Vande Mataram: The Biography of a Song গ্রন্থের আলোচনার সূত্র ধরে ‘বন্দে মাতরম্’-কে একটি জীবন্ত ঐতিহাসিক সত্তা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে বইটি শুধু তথ্যসংকলন হয়ে ওঠেনি; বরং একটি গান কীভাবে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রতীক, আবার একই সঙ্গে বিতর্কের উৎস হয়ে উঠতে পারে, তারও ব্যাখ্যা হাজির করেছে।
ড. গৌতম মুখোপাধ্যায় দীর্ঘদিন ধরে বঙ্কিমচন্দ্র-চর্চার সঙ্গে যুক্ত। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গবেষণা পত্রিকায় তাঁর লেখালেখি সুপরিচিত। অন্যদিকে, নবীন গবেষক ড. জয়ন্ত মাজিগোপ স্বাস্থ্য ও রোগের ইতিহাস নিয়ে গবেষণার জগৎ থেকে এসে এই যৌথ উদ্যোগে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।
গুরু-শিষ্যের যৌথ গবেষণার এই গ্রন্থের অন্যতম শক্তি এর দুই লেখকের ভিন্ন অথচ পরস্পর-পরিপূরক গবেষণা অভিজ্ঞতা। সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সিনিয়র ফ্যাকাল্টি সদস্য ড. গৌতম মুখোপাধ্যায় দীর্ঘদিন ধরেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদ নিয়ে গবেষণা করে চলেছেন। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গবেষণা পত্রিকা ও সাময়িকীতে তাঁর নিয়মিত লেখালিখি তাঁকে এই ক্ষেত্রের পরিচিত মুখ করে তুলেছে। জাতীয়তাবাদী ইতিহাসচর্চার পরিসরে তাঁর একাধিক গ্রন্থ ইতিমধ্যেই সমাদৃত। ভারতীয় ইতিহাস গবেষণা পরিষদ (আইসিএইচআর) থেকে বঙ্কিমচন্দ্র বিষয়ক তাঁর সাম্প্রতিক গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশের অপেক্ষায়। ফলে ‘বন্দে মাতরম্’-এর মতো একটি ঐতিহাসিক ও আবেগঘন বিষয় নিয়ে তাঁর আগ্রহ এবং দক্ষতা স্বাভাবিকভাবেই পাঠকের প্রত্যাশা বাড়িয়ে দেয়।
অন্যদিকে, সহ-লেখক ড. জয়ন্ত মাজিগোপ তুলনায় নবীন প্রজন্মের গবেষক। বর্তমানে পুরুলিয়ার মহাত্মা গান্ধী কলেজে কর্মরত এই গবেষক ২০১৯ সালে জুনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ অর্জন করেন। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল এবং সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করা জয়ন্তর গবেষণার মূল ক্ষেত্র স্বাস্থ্য ও রোগের ইতিহাস। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের বিভিন্ন গবেষণা পত্রিকায় তাঁর প্রবন্ধ ও গ্রন্থ-সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তাঁর লেখা বই-সমালোচনা স্থান পেয়েছে Indian Journal of History of Science-এর মতো মর্যাদাপূর্ণ পত্রিকায়।
একজন প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসবিদ এবং একজন উদীয়মান গবেষকের এই যৌথ প্রয়াস ‘বন্দে মাতরম্’ গ্রন্থকে শুধু তথ্যসমৃদ্ধই করেনি, দিয়েছে গবেষণাভিত্তিক দৃঢ়তা। ইতিহাস, জাতীয়তাবাদ এবং সাংস্কৃতিক বিতর্কের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে বইটি পাঠকের সামনে এমন কিছু তথ্য ও বিশ্লেষণ হাজির করে, যা বহু ক্ষেত্রেই নতুন ভাবনার খোরাক জোগাবে।
আজকের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে ‘বন্দে মাতরম্’ নিয়ে আবেগ যত প্রবল, ইতিহাসের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান ততটাই জরুরি। সেই প্রয়োজন থেকেই এই গ্রন্থের গুরুত্ব। যারা ‘বন্দে মাতরম্’-কে শুধুই একটি গান হিসেবে নয়, বরং ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দলিল হিসেবে বুঝতে চান, তাঁদের জন্য বইটি অবশ্যই সংগ্রহযোগ্য।
ছবি : গ্রন্থের প্রচ্ছদ, ড. গৌতম মুখোপাধ্যায় ও ড. জয়ন্ত মাজিগোপ