নিজস্ব প্রতিনিধি, কোটশিলা:
অভাবের তাড়নায় টাকা ধার। তার বিনিময়ে বন্ধক রাখতে হয়েছিল রেশন কার্ড। আর সেই সুযোগে বছরের পর বছর প্রকৃত উপভোক্তাদের প্রাপ্য সরকারি খাদ্যসামগ্রী তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠল গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দার বিরুদ্ধে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে ঝালদা ২ নম্বর ব্লকের উকমা গ্রামে। প্রায় পাঁচ থেকে সাত বছর আগে আর্থিক সঙ্কটের কারণে গ্রামের কয়েকটি তফসিলি জাতিভুক্ত কালিন্দী পরিবার গ্রামেরই কয়েক জনের কাছ থেকে টাকা ধার নেয়। অভিযোগ, সেই সময় সুষেন মাহাতো, মুরলী মাহাতো, চণ্ডী মাহাতো-সহ কয়েক জন ধার দেওয়ার শর্ত হিসেবে ওই পরিবারগুলির সব রেশন কার্ড নিজেদের কাছে রেখে দেন। এরপর থেকে তাঁদের নামে বরাদ্দ চাল, চিনি-সহ বিভিন্ন রেশন সামগ্রী নিয়মিত ডিলারের কাছ থেকে তোলা হলেও একদিকে চিকিৎসা, দারিদ্র্য এবং সংসারের চরম আর্থিক সঙ্কটের কারণে ধার শোধ করতে না পারায় রেশন থেকে বঞ্চিত থেকেছেন তাঁরা।
উপভোক্তা ভাদু কালিন্দী ও সন্ধ্যা কালিন্দী বলেন, "পেটের দায়ে আর স্বামীর চিকিৎসার জন্য সামান্য কিছু টাকা ধার নিয়েছিলাম। কিন্তু তার বদলে ওরা আমাদের রেশন কার্ড কেড়ে নেয়। গত ৫-৭ বছর ধরে আমাদের চাল, চিনি সব ওরাই তুলে বাজারে বেচে দিয়েছে বা নিজেরা খেয়েছে। আমরা দিনের পর দিন আধপেটা খেয়ে থেকেছি। সরকার আমাদের জন্য যে খাবার পাঠাচ্ছে, তা অন্য লোক লুটে নিচ্ছে আর পুলিশ-প্রশাসন এতদিন ঘুমোচ্ছিল? আমরা দোষীদের শাস্তি চাই এবং আমাদের পুরো রেশন ফেরত চাই।"
অভিযোগ সামনে আসতেই পুলিশ গ্রামে গিয়ে তদন্ত শুরু করে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, পুলিশের হস্তক্ষেপে কয়েকটি রেশন কার্ড উদ্ধার করে প্রকৃত মালিকদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে এখনও একাধিক কার্ড অন্যদের দখলে রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
রেশন কার্ড বন্ধকধারী সুষেন মাহাত বলেন, "আমি কোনো জোরজুলুম করিনি। ওরা নিজেদের ইচ্ছায় টাকা ধার নিয়েছিল এবং গ্যারান্টি হিসেবে কার্ডগুলো আমার কাছে জমা রেখেছিল। গ্রামীণ এলাকায় এমন লেনদেন তো হয়েই থাকে। টাকা ফেরত দিলে আমি কার্ড দিয়ে দিতাম। তবে রেশন তোলার বিষয়ে ডিলারের সঙ্গে কী চুক্তি ছিল, তা নিয়ে আমি এখন কিছু বলব না।"
ঘটনাকে ঘিরে একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। সরকারি নথি হিসেবে রেশন কার্ড হস্তান্তরযোগ্য নয়, তা সত্ত্বেও কী ভাবে বছরের পর বছর সেগুলি অন্যের দখলে থাকল? প্রকৃত উপভোক্তাদের নামে বরাদ্দ খাদ্যসামগ্রী অন্যেরা তুললেও তা প্রশাসনের নজর এড়াল কী করে? এই অনিয়মে আর কেউ জড়িত কি না, তা নিয়েও তদন্তের দাবি উঠেছে।
ঝালদা ২ নং পঞ্চায়েত সমিতি সভাপতি দীপক কুমার সিংহ জানান, "ঘটনাটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং মানবতা বিরোধী। সরকারি রেশন কার্ড এভাবে বন্ধক রাখা বা অন্যের রেশন তুলে নেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখছি। বিডিও এবং খাদ্য দফতরের ইন্সপেক্টরকে ব্লক স্তরে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রেশন ডিলারের কোনো যোগসাজশ থাকলে তার লাইসেন্স বাতিল করা হবে। পুলিশ ইতিমধ্যেই কিছু কার্ড উদ্ধার করেছে, বাকিগুলোও উদ্ধার হবে। এই চক্রের সাথে যুক্ত কাউকেই রেয়াত করা হবে না।"
ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে সরব হয়েছেন এলাকার বাসিন্দারা।