নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া:
কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে যে সমস্ত প্রতিকূলতা হার মানতে বাধ্য, তা আরও একবার প্রমাণ করল পুরুলিয়ার মাটি। দেশের তাবড় তাবড় প্রতিপক্ষকে টেক্কা দিয়ে ২০২৬ সালের সর্বভারতীয় সৈনিক স্কুল আন্তঃগোষ্ঠী হকি প্রতিযোগিতায় অনূর্ধ্ব ১৫ চ্যাম্পিয়ন হলো সৈনিক স্কুল পুরুলিয়া। ওড়িশার ভুবনেশ্বরে আয়োজিত এই মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্টে সোনা জয়ের পাশাপাশি, এই প্রথমবার মর্যাদাপূর্ণ নেহরু সাব-জুনিয়র হকি টুর্নামেন্টে খেলার টিকিট পাকা করল বাংলার এই তরুণ দল।
এই রূপকথার মতো সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে এক ভিন্ন লড়াইয়ের গল্প। দলের সিংহভাগ খেলোয়াড়ই উঠে এসেছে পশ্চিমবঙ্গ ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের অত্যন্ত সাধারণ পরিবার থেকে। কারও বাবা কৃষক, কারও বাবা দিনমজুর, তো কেউ আবার যুক্ত সাধারণ সেবামূলক পেশায়। আর্থিক অনটন বা সীমিত সুযোগ কোনো কিছুই বাধা হতে পারেনি এই কিশোরদের স্বপ্নপূরণে। ঘাসের মাঠে ঘাম ঝরিয়ে, চোট-আঘাত সব কিছু সহ্য করে এই দল চ্যাম্পিয়ন ।
এই জয়ের রূপরেখা তৈরি হয়েছিল চলতি বছরের শুরুতে। বিদ্যালয়ের বর্তমান অধ্যক্ষ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বদলে যায় প্রশিক্ষণের চেনা ছক। শৃঙ্খলা, আধুনিক কৌশলগত প্রশিক্ষণ এবং খেলোয়াড়দের মানসিক সংহতির ওপর বাড়তি জোর দেন তিনি।
পাশাপাশি, এই সাফল্যের পেছনে এক অদৃশ্য সেনাবাহিনী কাজ করেছে। একদিকে যেমন ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ কোচ ও ট্রেইনাররা, অন্যদিকে তেমনই দিন-রাত এক করে খেলোয়াড়দের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের খেয়াল রেখেছেন মেস স্টাফ, মেডিকেল ও ওয়ার্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট, পিটিআই এবং মেস ম্যানেজাররা। প্রত্যেকের এই সম্মিলিত টিমওয়ার্কই ব্যক্তিগত প্রতিভাকে রূপান্তরিত করেছে একটি অপরাজেয় শক্তিতে।
ছেলেরা যখন সোনা জিতে ইতিহাস লিখছে তখন পুরুলিয়ার গর্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বিদ্যালয়ের অনূর্ধ্ব-১৭ বালিকা দলও। কঠিন লড়াইয়ের পর এই প্রতিযোগিতায় তারা তৃতীয় স্থান ব্রোঞ্জঅধিকার করেছে। জঙ্গলমহলের মেয়েদের এই পারফরম্যান্স প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, সৈনিক স্কুল পুরুলিয়ায় নারী শক্তির উত্থানও এখন সময়ের অপেক্ষা।
পুরুলিয়ার লোকসংস্কৃতি আর সংগ্রামী ইতিহাসের সঙ্গে এই ক্রীড়া সাফল্য এক নতুন মাত্রা যোগ করল। প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ পরিবারের ছেলেদের এই জাতীয় স্তরের সাফল্য দেখে আনন্দিত শিক্ষক, অভিভাবক থেকে শুরু করে প্রাক্তন ছাত্র ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
বিজয় উদযাপনের পালা শেষ করে অনূর্ধ্ব-১৫ বালক দলের পাখির চোখ এখন নেহরু সাব-জুনিয়র হকি টুর্নামেন্ট। বাংলা তথা পুরুলিয়ার নাম জাতীয় ক্রীড়া মানচিত্রে খোদাই করে দেওয়া এই তরুণ হকি যোদ্ধারা প্রমাণ করে দিল স্বপ্ন দেখার সাহস থাকলে আর পরিশ্রম করার মানসিকতা থাকলে, যেকোনো অসম্ভবকেই সম্ভব করা যায়।