ক্রাইম ব্লক

বান্দোয়ানের জঙ্গলে মাওবাদীদের ডেরা থেকে উদ্ধার চার আগ্নেয়াস্ত্র, ৩৬ রাউন্ড গুলি

▪️বাংলা-ঝাড়খণ্ড সীমান্তে আরও অস্ত্র লুকনোর হদিশ। ▪️ মাস দেড়েকের মধ্যে ফের উদ্ধারের ইঙ্গিত পুরুলিয়ার পুলিশ সুপারের। ▪️মাওবাদীদের জেরাতে মিলেছে সূত্র।
বান্দোয়ানের জঙ্গলে মাওবাদীদের ডেরা থেকে উদ্ধার চার আগ্নেয়াস্ত্র, ৩৬ রাউন্ড গুলি

 

 

 

সুইটি চন্দ্র , পুরুলিয়া:

বান্দোয়ানের ঘন জঙ্গলে তল্লাশি চালিয়ে মাওবাদীদের লুকোনো অস্ত্র উদ্ধারে  বিরাট সাফল্য পেল পুরুলিয়া জেলা পুলিশ। উদ্ধার হয়েছে তিনটি .৩১৫ বোরের বোল্ট অ্যাকশন রাইফেল, একটি .৩৮ বোরের রিভলভার এবং ৩৬ রাউন্ড কার্তুজ। পুলিশের দাবি, উদ্ধার হওয়া কার্তুজগুলি দূরপাল্লার এবং যথেষ্ট ধ্বংসাত্মক। বাংলা-ঝাড়খণ্ড সীমান্তের জঙ্গলে আরও অস্ত্র লুকনো রয়েছে বলে খবর পেয়েছে পুলিশ। সেগুলির সন্ধানে তল্লাশি চলছে। আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে আরও অস্ত্র উদ্ধার হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন পুরুলিয়ার পুলিশ সুপার কুমার শানি রাজ।

রবিবার বেলগুমা পুলিশ লাইনে সাংবাদিক সম্মেলন করে পুলিশ সুপার জানান, পুরুলিয়া ঝাড়খণ্ড সীমান্তে বান্দোয়ান থানা এলাকার গভীর জঙ্গলে একটি ব্যাগের মধ্যে অস্ত্রগুলি রাখা ছিল। এলাকাটি এতটাই দুর্গম যে আশপাশে কোনও বাড়িঘর নেই। মেটাল ডিটেক্টর নিয়ে জঙ্গলের বিভিন্ন অংশে তল্লাশি চালিয়ে অস্ত্রগুলি উদ্ধার করা হয়। তবে সেগুলি বর্তমানে সম্পূর্ণ সচল কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, অস্ত্রগুলির ফায়ারিং পিন অক্ষত রয়েছে। ম্যাগাজিনের বিভিন্ন অংশও ঠিকঠাক অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে।

পুলিশ সুপারের বক্তব্য, গত কয়েক মাসে মাওবাদীদের বিরুদ্ধে অভিযানে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য এসেছে। অনেক মাওবাদী আত্মসমর্পণ করেছেন, অনেকে গ্রেফতার হয়েছেন। ঝাড়খণ্ডে এনকাউন্টারে মাওবাদীদের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। তাঁর দাবি, সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলির পর বাংলা-ঝাড়খণ্ড সীমান্তের জঙ্গল এলাকায় মাওবাদীদের কার্যকলাপ সংক্রান্ত খবরের ভিত্তিতে নজরদারি আরও বাড়ানো হয়।

এই অভিযানে কলকাতার এসটিএফ, বাঁকুড়া জেলা পুলিশ, ঝালদা মহকুমা পুলিশ, পুরুলিয়া জেলা পুলিশের অ্যান্টি-মাওবাদী সেল, সিআইএফ এবং সিআরপিএফের সদস্যেরা যুক্ত ছিলেন বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার। অতিরিক্ত পুলিশ সুপারদের পাশাপাশি তিনি নিজেও একাধিকবার ওই এলাকায় গিয়েছেন বলে জানান।

পুলিশ সুপার জানান, ঝাড়খণ্ড পুলিশের হাতে মদন, রবি ও মীরা নামে তিন জন গ্রেফতার হওয়ার পর তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদে কিছু সূত্র মেলে। সেই সূত্র যাচাই করে বান্দোয়ান ও সংলগ্ন জঙ্গল এলাকায় তল্লাশি শুরু হয়। প্রাক্তন মাওবাদী, বর্তমানে পুলিশের স্পেশাল পুলিশ অফিসার (এসপিও) হিসেবে কর্মরত ব্যক্তিদের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হয়। স্থানীয় সূত্রের খবরের সঙ্গে সেগুলি মিলিয়ে দেখার পরই অস্ত্রের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় বলে পুলিশের দাবি।

চলতি বছর ৫ আগস্ট ঝাড়খণ্ডের দলমা পাহাড় ও লাগোয়া এলাকা থেকে সিপিআই (মাওবাদী)র বাংলা - ঝাড়খণ্ড - ওড়িশা আঞ্চলিক কমিটির সদস্য মদন মাহাতো, দলমা সাব জোনাল কমান্ডার রবি সিং সর্দার এবং তার স্ত্রী পুরুলিয়ার বলরামপুর থানার আমকোচা গ্রামের মীরা পাহাড়িয়া গ্রেপ্তার হন। ওই সময় তাঁদের কাছ থেকে প্রচুর অস্ত্র শস্ত্র উদ্ধার হয়। ঝাড়খণ্ড পুলিশের হেফাজতে থাকা ওই তিন মাও নেতা - নেত্রীকে পুরুলিয়া জেলা পুলিশের তরফে  জিজ্ঞাসাবাদ করতে গিয়েছিলেন ঝালদা মহকুমা পুলিশ আধিকারিক গৌরব ঘোষ। জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতে ঝাড়খণ্ড লাগোয়া বান্দোয়ানের সীমানার পাহাড়ি জঙ্গলে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে লাগাতার তল্লাশিতে এই সাফল্য পাওয়া যায়। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপারেশন) বিদ্যাগর অজিঙ্কা অনন্ত এর নেতৃত্বে অভিযান চলে।

পুলিশ সুপারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুরুলিয়া জেলায় বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১৮০-১৯০ জন প্রাক্তন মাওবাদী এসপিও হিসেবে কাজ করছেন। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যও এই অভিযানে সাহায্য করেছে।

বান্দোয়ান ও ঝাড়খণ্ডের পটমদা থানার সীমান্তবর্তী জঙ্গল এলাকায় আরও অস্ত্র লুকনো রয়েছে বলে পুলিশের কাছে নির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে। পুলিশ সুপার জানান, এমন অন্তত তিনটি সম্ভাব্য জায়গার খবর তাঁদের হাতে এসেছে। তবে সেগুলি যাচাই করার পরই পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

তাঁর বক্তব্য, জঙ্গলের মধ্যে অস্ত্রের অবস্থান চিহ্নিত করা অত্যন্ত কঠিন। তাই ধাপে ধাপে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। মাওবাদীদের বিরুদ্ধে অভিযানে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা উল্লেখ করে পুলিশ সুপার বলেন, এই ধরনের অস্ত্র উদ্ধার অভিযান চলবে। আগামী দিনেও আরও উদ্ধারের খবর সামনে আসতে পারে।

উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলি ঠিক কোন মাওবাদী সদস্য ব্যবহার করতেন, তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার। তাঁর দাবি, এগুলি প্রাক্তন মাওবাদী ক্যাডারদের ফেলে যাওয়া অস্ত্র। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের সূত্র ধরে সীমান্তবর্তী জঙ্গলে আরও তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ।