ব্লক ভোটের খবর

এসআইআর কেড়েছে বাবাকে, ভোটের বোতাম টিপে শোধ তুললেন ছেলে

২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বরের সেই দুপুরটা এখনও তাড়া করে ফেরে পাড়া ব্লকের আনাড়া গ্রামের কানাই মাঝিকে। বাবাকে হারিয়েছেন এস আই আর আতঙ্কে।
এসআইআর কেড়েছে বাবাকে, ভোটের বোতাম টিপে শোধ তুললেন ছেলে

 


সুইটি চন্দ্র, আনাড়া:

ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবকের চোখে বেদনা আর প্রতিশোধের আগুন। আঙুলে কালির দাগ পড়ার আগেই যেন মনের মধ্যে আর এক দাগ স্পষ্ট। সেটাই তার প্রতিবাদ, সেটাই তার প্রতিশোধ।
২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বরের সেই দুপুরটা এখনও তাড়া করে ফেরে পাড়া ব্লকের আনাড়া গ্রামের কানাই মাঝিকে। ভোটার তালিকার খসড়ায় নাম না থাকায় শুনানির নোটিস পেয়েছিলেন তাঁর বাবা, ৮২ বছরের দুর্জন মাঝি। ২৫ ডিসেম্বর সেই নোটিস হাতে আসার পর থেকেই আতঙ্ক গ্রাস করেছিল বৃদ্ধকে। খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধ। পরিবারের সকলে আশ্বাস দিয়েছিলো শুনানিতে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আতঙ্ক কি অত সহজে যায়? ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ বাদ কেন? এনুমারেশন ফর্ম জমা দেওয়ার পরেও নাম নেই কেন? উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই যেন ভিতরটা ভেঙে পড়েছিল।

সেই দিন সকাল ৮টা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন দুর্জন। বলেছিলেন, টোটো ডাকতে যাচ্ছেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই খবর আসে, আনাড়া-রুকনি রেললাইনে ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পড়ে রয়েছে তাঁর দেহ। পরিবার এবং স্থানীয়দের কাছে মৃত্যুর কারণ বুঝতে বাকি থাকেনি।

সেই রাতেই ছেলে কানাই মাঝি থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁর অভিযোগ, বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী নির্বাচন প্রক্রিয়ার গাফিলতি। চিফ ইলেকশন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং রাজ্যের নির্বাচন কর্তা মনোজকুমার আগরওয়ালের নামও তোলেন তিনি অভিযোগে। যদিও মামলা রুজু হতে লেগে যায় প্রায় এক মাস।
তার পর থেকে দিনগুলো বদলেছে, কিন্তু ক্ষত শুকোয়নি। রাজনৈতিক মহলেও সাড়া পড়েছিল ঘটনায়। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়—কানাইকে নিয়ে গিয়েছিলেন দিল্লিতে, তুলেছিলেন প্রতিবাদের সুর। পরে স্পেশাল হোমগার্ডের চাকরিও পান ২৭ বছরের ওই যুবক। এখন পুরুলিয়ার বেলগুমা পুলিশ লাইনে চলছে তাঁর প্রশিক্ষণ।
প্রয়াত দুর্জন মাঝির ছেলে  কানাই মাঝি বলেন, "একটা নোটিশ এসেছিল। নোটিশটা নিয়ে খুবই চিন্তিত ছিল বাবা। যেদিন হিয়ারিং এর ডেট ছিল সেদিন টোটো ভাড়া করতে গিয়ে আর ফিরে এল না । তারপরে আমরা যে দেখলাম রেললাইনের পাশে মৃতদেহ পড়ে আছে । এটা সম্পূর্ণ আত্মহত্যা। এসআইআর-এ নাম নথিভুক্ত  হয়নি বলে । বাবা নেই খুবই একা মনে হচ্ছে। বাবা থাকলে হয়তো একসাথে ভোট দিতে যেতে পারতাম"।
সংসারের ভিতরে ফাঁকা জায়গাটা আজও পূরণ হয়নি। পশুপালন করে সংসার চালানো দুর্জনের অনুপস্থিতি আজও কুরে কুরে খায় পরিবারকে। বৃহস্পতিবার সকালে ভোট দিতে যাওয়ার আগে বাবার মূর্তি পরিষ্কার করেন কানাই। তারপর প্রথম পক্ষের স্ত্রী সীতামণি মাঝিকে নিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার পথ হেঁটে পৌঁছন ফুলুরডি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বুথে।
মৃত দুর্জনের স্ত্রী সীতামনি মাঝি বলেন," খুব খারাপ লাগছে। একা লাগছে নিজেকে। এইবারের ভোটটা প্রতিবাদের ভোট"।
ভোটকক্ষের ভেতরে ঢোকার আগে একবার চোখ বন্ধ করেন কানাই। তারপর বোতামে চাপ। সেই চাপেই যেন জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
তবে প্রশ্ন রয়ে যায়, একটি ভোট কি মুছে দিতে পারে সেই আতঙ্ক, সেই ক্ষতি? নাকি কালির দাগের আড়ালেই থেকে যায় না-বলা বহু প্রশ্ন?